thrusday-throwback-review-myo
thrusday-throwback-review-myo

Shakha Prashakha-

বয়সের সাথে সাথে এক মহান শিল্পীর সৃষ্টির ভঙ্গিমারও পরিবর্তন হয়। সময় যত এগিয়ে যায়, সেই শিল্পীর জগৎ-সমাজের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে থাকে। একই কথা আমরা সত্যজিৎ রায়ের ক্ষেত্রেও বলতে পারি। তার উপান্ত্য ছবি অর্থাৎ শেষের আগের ছবি ‘শাখাপ্রশাখা(Shakha Prashakha) ’ তেও স্পষ্টত আমরা দেখতে পাই পরিচালক তার চারপাশে বেড়ে চলা নৈতিক দুর্দশার প্রতি গভীর ভাবে বিক্ষুব্ধ। পরিচালকের নিজস্ব রচিত গল্প থেকে তৈরি এই ছবিতে সত্যজিৎ রায় বোধ হয় দেখাতে চেয়েছেন এক সময়ের যে সততা ও কর্তব্যপরায়ণতার জন্য মানুষ সাফল্য লাভ করত, এখন সেই সবের এর কোনো অস্তিত্ব নেই।

সাফল্যের সংজ্ঞা এখন সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। গোড়া থেকে যদি দেখা যায়, এই গল্প মজুমদার পরিবারের, মজুমদার বংশের চার প্রজন্ম এক ছাদের তলায় আসে যখন আনন্দ মোহন মজুমদার, তার সত্তরতম জন্মদিনে সম্মানজ্ঞাপন অনুষ্ঠানে হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়েন। খবর পেয়ে ছুটে আসে বড়, সেজো ও ছোট ছেলে, যারা প্রত্যেকেই নিজস্ব ক্ষেত্রে সফল। সামাজিক ভাবে ব্যর্থ একমাত্র মেজো ছেলে প্রশান্ত মজুমদার, যে প্রথমে যশস্বী ছাত্র থাকলেও, লন্ডনে থাকাকালীন এক গাড়ী দুর্ঘটনায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন, ও সেই থেকে বাবার সাথেই থাকেন।

এছাড়া সেই বাড়িতে থাকে আনন্দমোহন এর বাবা, 93 বছর বয়সী অভয় চরণ মজুমদার, বার্ধক্যের ভারে এখন সম্পূর্ণ ভাবে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। অপ্রত্যাশিত এই বিপর্যয়ে সমস্ত পরিবার এক ছাদের তলায় এসে যুক্ত হয়। অর্থাৎ সমস্ত শাখা প্রশাখা(Shakha Prashakha) সম্মিলিত হয়ে একটি পরিপূর্ণ বৃক্ষের রূপ নেয়।

Shakha Prashakha

আপাত দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক, সম্পন্ন এই পরিবারের অন্তর্চিত্র ক্রমশঃ সুস্পষ্ট হতে থাকে। দেখা যায় বড় ও সেজো ছেলে, প্রবোধ ও প্রবীর মজুমদার, যারা আজকে সমাজের দৃষ্টিতে সফল, তারা দুর্নীতি ও অসাধুতার আশ্রয় নিয়েছে। তাদের মতে সমাজে আজকের যুগে সততার বুলি অবান্তর। তাদের স্ত্রীরা তাদের এই অসৎ পন্থা সম্বন্ধে জানে, তাও চেষ্টা করেন নিজেদের কে ফাঁকি দিয়ে বেঁচে থাকার। ছোটো ছেলে প্রতাপ মজুমদার অনেকটা পরিচালক বা সাধারণ দর্শকের পটভূমিকায় অবতীর্ণ, যে সততা এবং দুর্নীতির মাঝে দ্বিধা দ্বন্দ্বে রয়েছে। যে তার কাজের জায়গায় জালিয়াতি সহ্য করতে না পেরে ইস্তফা দিয়েছে ও নিজের সৃষ্টিশীল সত্তাটাকে নতুন ভাবে আবিষ্কারে বেরিয়েছে।

ছোটবেলার নৈতিক শিক্ষা তার মধ্যে এত গভীরে গেঁথে রয়েছে যে সে চট করে সেই শিক্ষাকে উপড়ে ফেলতে পারে না, আবার পুরোপুরি ভাবে তার মনের মর্জি অনুসারে চলতে পারে না।কারণ আমাদের সমাজ তথাকথিত ভাবে সাফল্যের একটা নির্দিষ্ট ছক বেঁধে দিয়েছে, এর বাইরে হাঁটা মানেই বংশের নামে চুনকালি মাখানো। তার ওপর আনন্দ মোহন মজুমদার সেই শহরে প্রায় একজন মনীষীর রূপ নিয়েছেন, যার উন্নতি ও গৌরবের উদাহরণ দেওয়া হয়। এমনকি তিনি যে শহরে থাকেন তার নাম পাল্টে আনন্দপুর রাখা হয়েছে, সেক্ষেত্রে পরিবারের কোনো এক সদস্য “মুখে রং মেখে” অভিনয় করবে, এ এক কলঙ্কই বটে! একমাত্র প্রতাপ ই মেজদা ও পিতামহের প্রতি স্নেহশীল।

আর সবার থেকে আলাদা হয়ে প্রতাপ, প্রশান্ত কে অবহেলা না করে তার সাথে আর পাঁচটা মানুষের মত করে কথা বলে, এমনকি নিজের দ্বিধাময় পরিস্থিতির কথা জানিয়ে মেজদার কাছে পরামর্শ চায়। প্রশান্তর মানসিক উত্তেজনার মুহূর্তে তাকে শান্ত করে। পরিবারের সবচেয়ে কনিষ্ঠ সদস্য, প্রবীর ও তপতীর ছেলে ডিঙ্গো। এখানে লক্ষ্যনীয় পরিবারের সবচেয়ে প্রবীণ সদস্য অভয় চরণ মজুমদার ও কনিষ্ঠতম সদস্য ডিঙ্গো দুজনেই এই নীতি-দুর্নীতির জঞ্জাল থেকে অনেক দূরে, একজন জীবনের শেষ প্রান্তে চলে এসেছেন প্রায়, আরেকজন ক্রমশঃ এই জগৎ সম্বন্ধে তার গুরুজনদের থেকে শিক্ষা নিচ্ছে। কিন্তু সূচনা টা এতটা জটিল ছিল না।

বড়ছেলে প্রবোধের, সাংবাদিককে দেওয়া একটি ইন্টারভিউ থেকে আমরা জানতে পারি, অভয় চরণ ছিলেন একজন স্কুল হেডমাস্টার যিনি সারা জীবন সততার সাথে কাজ করে গিয়েছেন এবং ছাত্রদেরকে নৈতিকতার পাঠ দিয়েছেন, সেই ধারা বজায় থেকেছে পুত্র আনন্দ মোহনের মধ্যে যে নিজের নিষ্ঠা, অধ্যবসায় ও সততার জোরে একটি কোম্পানিতে নিচুতলার কর্মী থেকে, উন্নতি করে কোম্পানিটির অংশীদারিত্ব লাভ করেন। তাঁর মতে জীবনে সাফল্যের দুই মন্ত্র, “Work is worship” এবং “Honesty is the best policy”।কিন্তু আপাত দৃষ্টিতে “সফল” বড় ছেলে ও সেজো ছেলের কাছে এসব মূল্যহীন। তাদের মতে, লোকে এটাই দেখবে যে বাড়ির বাইরে কতগুলো গাড়ি দাঁড়িয়ে, অথবা বাড়িতে কতগুলো শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ঘর আছে, বা কতটা জাঁকজমক ও আভিজাত্য দেখাতে পারে।

কারো যায় আসে না, এসব করতে গিয়ে কেউ কোন পন্থা অবলম্বন করেছে। আর এসবের মাঝে বোধ হয় যাঁতাকলে পেশা হচ্ছে তাদের স্ত্রীরা। প্রবোধের স্ত্রী উমা, তার স্বামীর ট্যাক্স ফাঁকির কথা সব জানে, কিন্তু জেনেও নাজানার অভিনয় করে যান সবার সামনে। প্রবীরের বিভিন্ন চরিত্রেদোষের কারণে স্ত্রী তপতীর সাথে সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। তপতী মনের দিক থেকে দেবর প্রতাপের ওপর নির্ভরশীল, প্রতাপের কাছেই একমাত্র বন্ধুত্বের আস্বাদ পায়।তাই প্রতাপের মুখে প্রণয়ীর কথা শুনে সে মনে মনে কষ্ট পায়। সম্ভবত সত্যজিৎ রায় বোঝাতে চেয়েছেন, যারা অসৎ পথ অবলম্বন করেছে, জীবনে শান্তি তাদের কাছে দুর্মূল্য বস্তু। হয়তো প্রশান্ত মানসিক ভাবে অসুস্থ বলেই নিষ্কলঙ্ক রয়ে গিয়েছে।

অথবা নিষ্কলঙ্ক বলেই সমাজের চোখে সে মানসিক ভারসাম্যহীন, কে বলতে পারে! এই প্রশান্তর চরিত্রকে দক্ষতার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। রোলটা চ্যালেঞ্জিং ছিল, সেইসাথে এটি এক মাত্র রোল ছিল, যেখানে সত্যজিৎ রায় সম্পূর্ণ ভাবে তার ইনস্ট্রাকশন ও তার আইডিয়া অনুযায়ী চরিত্রটাকে ফুটিয়ে তুলতে বলেছিলেন। তার চরিত্র অনেকটা যাত্রাপালায় বিবেকের চরিত্রের মত, সময় সময় আমাদের অন্যায়ের গোড়ায় আঘাত করে আমাদের ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়ে যায়। তবে বাকিদের কেও খাটো করা যায়না। বড়ো ছেলে প্রবোধ এর চরিত্রে হারাধন ব্যানার্জী থেকে শুরু করে কিশোর শিল্পী সোহম চক্রবর্তী, সবাই পোড় খাওয়া অভিনেতা।

এমনকি অবাক লাগে বর্ষীয়ান ব্যক্তি প্রমোদ গাঙ্গুলি মাত্র দুটি শব্দের সাহায্যে, ডটেজ পর্যায়ের মানসিক অবস্থা ও অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলেছেন, ভাবা যায় না। রাতের বেলায় হঠাৎ করে অভয় চরণ, রঞ্জিত মল্লিক অভিনীত চরিত্র, প্রতাপের মুখোমুখি দাঁড়ায়, সেই সময় ধীরপায়ে এসে প্রতাপের বুকে আঙ্গুল রাখে,প্রবীরের সাথে আমরাও অল্প রোমাঞ্চিত হয়ে উঠি। যেনো দর্শকের প্রতিনিধি প্রতাপকে বর্ষীয়ান সততার প্রতিমূর্তি জিজ্ঞেস করে গেলো, তোমার মন এখনো নির্মল আছে তো? নাকি কলুষিত হয়ে উঠেছে। যখন প্রতাপ সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে তখন যেনো বলে গেলেন, নিজের মন যা বলছে সেই রাস্তায় চলো। তবে এর থেকেও বেশি প্রভাবকারী দৃশ্য যেখানে, সমস্ত তৃতীয় প্রজন্ম এক সাথে খেতে বসেছে।

প্রবোধ জুয়া খেলা, মদ্যপান এর মত আনুষঙ্গিক দোষের জন্য যখন প্রবীরকে খোঁচা দিচ্ছেন, সেই সময় প্রবীরও জবাবে বড়দার সমস্ত গোপন অসাধু পন্থায় টাকা অর্জনের কথা সবার সামনে প্রকাশ করে। এই কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির মাঝে হঠাৎ করে প্রশান্তর ফিট দেখা দেয়। সে হাত দিয়ে টেবিল ক্রমাগত চাপড়াতে থাকে ও মুখকে বাঁকাতে থাকে। এই দৃশ্য দেখতে না পেরে দুই বউ নিজেদের চোখ ঢেকে ফেলে। বড় ও সেজো ছেলে চিৎকার করে প্রতাপকে নির্দেশ দেয়, প্রশান্তকে থামাতে। এখানে অভুতপূর্ব ভাবে সত্যজিৎ রায় দেখিয়েছেন কিভাবে প্রশান্তর এই টেবিলে আঘাত করা একটু একটু করে তাদের সভ্য, ভদ্র মুখোশটাকে ভেঙে দিয়ে তাদের ভন্ডামিকে তাদের conscience এর সামনে তুলে ধরে।

স্ত্রীয়েরা আজ পর্যন্ত স্বামীদের দুর্নীতির স্বরূপ থেকে মুখ ঘুরিয়ে ছিল, আজ সেই নগ্ন বাস্তব সবার সামনে বেরিয়ে যাওয়াতে ভয়ে নিজেদের চোখ বন্ধ করে নিয়েছে। বাস্তবে দেখা যায়, প্রত্যেকেই একে অপরের নৈতিক অধঃপতন নিয়ে ভালো ভাবে অবগত, কিন্তু শুধুমাত্র আদর্শবান বাবা ও সমাজের কাছে ধোকার টাঁটি‌ তৈরি করে রেখেছে। কিন্তু আশ্চর্য্য ভাবে ভাইদের এই দুর্নীতিপরায়ণতা সম্বন্ধে আগে থেকেই প্রশান্ত জানত। এমনকি প্রথম দৃশ্যেই আমরা দেখি প্রশান্ত তার বাবাকে সাবধান করে দিচ্ছে, আজ বিকেলে বাজ পড়বে, অর্থাৎ কিছু অঘটন ঘটবে। সমস্ত কারণের জন্য শেষ পর্যন্ত সমাজের চোখে অস্বাভাবিক প্রশান্তই বাবার এক মাত্র অবলম্বন হয়ে ওঠে। পৃথিবী হয়ত এখন অসততার জ্বালানিতে এগিয়ে চলেছে, কিন্তু এই ছোট্ট কোনটিতে আজও “Honesty is the best policy”।

Follow us on FacebookTwitter

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here