taki-tells-review-klikk-myo
taki-tells-review-klikk-myo

Taki Tells

ভারতীয় প্রচলিত সিনেমার ওপর একটা বদনাম আছে। তারা নাকি প্রায় সমস্ত ধরনের ছবিকেই রোমানটিসাইজ করে ফেলে। তাতে গল্পের মূল উপাদান, তার মধ্যেকার বাস্তব আস্বাদ টাই আর খুঁজে পাওয়া যায় না। গ্যাংস্টার ক্রাইম সিনেমার অবস্থা এখানে বোধ হয় সবচেয়ে বেশি হতাশাজনক। প্রেমের ওভারডোজ, আইটেম গান এই ধরনের অপ্রয়োজনীয় উপাদানে আসল উদ্দেশ্য, দর্শকের কাছে পরিস্থিতির উদ্বেগ ও ভয়াবহতা ফুটিয়ে তোলা, প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনুরাগ কাশ্যপ সেই আস্বাদ টাকে অক্ষুন্ন রাখতে পেরেছিলেন বলে, ‘Gangs of Wasseypur’ গত দশকে বিশ্বের সেরা একশটি সিনেমার মধ্যে জায়গা করে নিতে পেরেছে।

বাংলাতেও এর আগে ক্রাইম, সিন্ডিকেট, গ্যাংওয়ার নিয়ে ওয়েব সিরিজ, সিনেমা অনেক কিছু হয়েছে। সেখানেও সাফল্যের হার আশাপ্রদ নয়। এই পরিস্থিতি তে Klikk এর নতুন ওয়েব সিরিজ ‘Taki Tells’ নতুন করে আপনাকে এই ক্রাইম জনরাতে আগ্রহী করে তুলতে পারে। অভিনেতা-পরিচালক সুব্রত গুহ রায়ের পরিচালনায় ছয় এপিসোডের এই সিরিজ গত তেইশে জুলাই মুক্তি পেয়েছে Klikk এ। ট্রেলার দেখে যা প্রত্যাশা করা যায়, প্রথম এপিসোড আরো অনেক বেশি চমক দেয়।

গল্পের পটভূমি টাকি মফঃস্বল, যেখানে প্রকাশ্য দিবালোকে রক্ত ঝরে। দুই পাচারকারী দলের মধ্যে সশস্ত্র বিবাদ চলে। মৃত্যু, হিংসা, রক্ত একটা গা সওয়া মত হয়ে গেছে। তাই দোকানের সামনে রাত্রে ঘটে যাওয়া হত্যায় পড়ে থাকা রক্ত ও দেহের অবশেষ বিরক্ত মুখে কিন্তু অবলীলাক্রমে পরিষ্কার করা হয়। আর আইন জেনে বুঝেও মুখ ঘুরিয়ে। পুরো পরিস্থিতিকে প্রথম থেকে দুর্ধর্ষ ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, পরিস্থিতির ভয়াবহতা, আতঙ্কে দিন কাটানোর এত নগ্ন রূপান্তরকরণ আমি অন্তত দেখিনি।

আর এর মাঝে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে কি সুচারুভাবে! গল্পের নায়ক ইন্সপেক্টর শুভঙ্কর বক্সী একজন টিপিকাল কপ সিনেমার স্বাস্থ্যবান, শারীরিক ভাবে সক্রিয় ব্যক্তি নন। সিভিক ভলান্টিয়ার তারক সামন্ত পুলিশ স্টেশনে দাঁড়িয়ে, ফোনে ব্যস্ত থাকে। ওসি অসীম দত্ত চরম দুর্নীতিপরায়ন, নিজেদের অধস্তন কে নোংরা ভাষায় অপমান করেন।

আসলে এই ধরনের স্টোরিটেলিংয়ে এই বাস্তবতা টা দেখানো প্রয়োজন ছিল। প্রতিদিন নদী পেরিয়ে পশুর মত করে মানুষ পাচার হয়, আর পুলিশ সব জেনেও মুখ ঘুরিয়ে থাকে। যে রাত থেকে ঘটনা শুরু, সেই রাতেই শুভঙ্কর বক্সীর কাছে এক রহস্যময়ী মহিলার ফোন আসে, আর তারপরেই পুলিশ, আর পরস্পর বিরোধী গ্যাংদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। ট্রেলার থেকে আমি রক্তাক্ত হিংসার আন্দাজ পাওয়া যায়, কিন্তু এই ধরনের পরিচালনা দেখা আশাতীত। কম বাজেট এই সিরিজ উপভোগ করার পথে প্রধান অন্তরায়। গুলি চলার দৃশ্য গুলোতে অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাও বলতে হবে অল্প বাজেটে যে বাংলার আগ্রহী পরিচালকরা অসাধারণ কাজ করে দেখাতে পারেন তা অত্যন্ত স্পষ্ট।

taki-talks-kilkk

অভিনয়ের প্রসঙ্গে এলে বলতে হয়, সাগ্নিক চ্যাটার্জী (সিনিয়র), শংকর চ্যাটার্জী, অনির্বাণ ভট্টাচার্য্য এবং খোদ সুব্রত গুহ রয় বাংলা বিনোদন জগতে চেনা মুখ। কিন্তু তার মধ্যেও বাকি অপেক্ষাকৃত অচেনা অভিনেতারা যেভাবে অভিনয়ে প্রাণ ঢেলেছেন, তা বলার মত। বিশেষ করে গ্যাংলর্ড নরেন সুদ্দা র চরিত্রে তরঙ্গ সরকার অসাধারণ। টলিউড যদি ঠিক করে ব্যবহার করতে পারেন তো অসাধারণ একজন অভিনেতা আসতে চলেছে। পর্দায় দেখলেই একটা ভয় কাজ করে, তরঙ্গ বাবুর চরিত্রকে দেখে, আর এই ভয় একেবারে প্রথম সিনেই প্রতিষ্ঠিত হয়। গানের ব্যবহার দুর্দান্ত। বিনীত রঞ্জন মৈত্র কে এর জন্য কুর্নিশ। তবে এই সিরিজের খারাপ দিক ও রয়েছে।

গল্পের পটভূমিকা এতটা অনন্য, এত উপাদান, সুন্দর ভাবে চরিত্র সাজানোর পরেও গল্প হঠাৎ করে কেমন খেই হারাতে শুরু করলো। আর শেষে গিয়ে যা দাঁড়ালো, সেটা কিছুটা হলেও হতাশাজনক। এই সিরিজের যা উপাদান ছিল, তাতে আরামসে ‘Mirzapur’ এর মত একাধিক সিজনের সুপারহিট ক্রাইম ওয়েব সিরিজ বানানো যেত। আমি শেষে এসেও বুঝতে পারছি না, রহস্যময়ী মহিলার বর্তমান অবস্থা কি? আর আমি ইচ্ছে করেই এই সিরিজে যে ইঙ্গিত দেখানো হয়েছে, তাকে অগ্রাহ্য করছি, কারণ তাকে মেনে নিলে, বাস্তবতার এই গুণকীর্তন এ বড়ো একটা প্রশ্নচিহ্ন এসে পড়বে।

বিনোদনের দিক নিয়ে ভাবতে গিয়ে এমন অনেক কিছু উপাদান পরিচালক রেখেছেন, যেগুলো অনাবশ্যক, যেমন সিভিক ভলান্টিয়ার তারকের বাড়াবাড়ি কমেডি, শুভঙ্কর বক্সীর মেয়ের প্রেমের সম্পর্ক, আর সবচেয়ে বেশি নমিতা চক্রবর্তীর, ইন্সপেক্টর শুভঙ্করের স্ত্রীর চরিত্রে কর্কশ, কোলাহলপূর্ণ অভিনয়। বাইরের ঘটে চলা কাণ্ড নিয়ে ততক্ষণ পর্যন্ত তার বিন্দুমাত্র উদ্বেগ নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত না বাড়ির লোকের কোনো সমস্যা হচ্ছে। আর সব শেষে বলব ইন্সপেক্টর শুভঙ্কর বক্সীর চরিত্রে শঙ্কর চক্রবর্তী, অভিনয়ে আর একটু খরতা আনতে পারতেন।

আমি কিন্তু এই সমস্ত সমস্যার জন্য কম বাজেটকেই দায়ী করবো। আশা করছি ‘Taki Tells’ এর দ্বিতীয় সিজন আরো জাঁকালো ভাবে ফিরে আসবে। Klikk এর কাছে অনুরোধ থাকবে, ভালো গল্প নির্ভর করে বর্তমান বাজেটের প্রায় তিনগুণ বাজেট বিনিয়োগ করলে, অসাধারণ কিছু ফলাফল উঠে আসবে। কিন্তু সত্যি বলতে দেখতে শুরু করে ‘Taki Tells’ কে 100 তে 80 দিয়ে দেওয়ার পর, শেষ পর্যন্ত 65 তে নেমে আসতে বাধ্য হলাম। তবে খারাপের মধ্যে থেকে ভালো বেছে না নিলে, পরমহংস পাপ দেবেন।

Follow us on Facebook, Twitter

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here