ten-years-of-mesmerizing-audiences-bengali-web-series-myo
ten-years-of-mesmerizing-audiences-bengali-web-series-myo

বাইশে শ্রাবণের দশ বছর-

30শে সেপ্টেম্বর,2011। বড়পর্দায় মুক্তি পেল সৃজিত মুখার্জীর পরিচালিত দ্বিতীয় ছবি ‘বাইশে শ্রাবণ’। গল্প, সংলাপ, চিত্রনাট্য স্বয়ং পরিচালক; সুর দিয়েছেন অনুপম রায়। অভিনয়ে প্রসেনজিত চ্যাটার্জী, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, রাইমা সেন, আবীর চ্যাটার্জী, গৌতম ঘোষ। কি ছিল এই ছবিতে যে এক দশক পরেও আমরা মুগ্ধ হয়ে আছি। সেই সময়ে কিন্তু এই সিনেমার ডায়লগ কি গল্প কি গান চরম জনপ্রিয়তা পায়। আমাদের প্লেলিস্টে ‘এই শ্রাবণ’ বা ‘গভীরে যাও’ কিন্তু এখনো জায়গা করে নেয়। বলা যায়, এই বাইশে শ্রাবণের পর থেকে বাংলা সিনেমায় ক্রাইম থ্রিলার আবার নতুন করে বেঁচে ওঠে। এর আগে সৃজিত মুখার্জীর ডেবিউ ছবি ‘অটোগ্রাফ’-এর মাধ্যমে নব্বই দশকের সুপারস্টার আবার দর্শক মহলের চর্চায় এলেন।

ইস্পেশালি ঋতুপর্ণ সেনের বিশেষ বিশেষ সিনেমা বাদে বাকি সময়ে তীব্র কমার্শিয়াল সিনেমা করে গেছেন। এমনকি ২০০০ দশকের শেষের দিকে প্রসেনজিতের সিনেমা মানে মিস্টার ফান্টুস ও গ্যাঁড়াকল। ২০১০ এ পরপর ‘অটোগ্রাফ’ ও ‘মনের মানুষ’ প্রসেনজিতের সম্বন্ধে মানুষের ধারণাকে সম্পূর্ণ ওলোট পালোট করে ফ্যালে। তার দূর্ধর্ষ অভিনয়, চরিত্র, ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতার প্রতি দর্শকের সমস্ত দৃষ্টিকে টেনে নিয়ে আসে। প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জী সেদিক দিয়ে কোনোদিনই দর্শকের দৃষ্টির আড়ালে যাননি। ছোটবেলার বাঙালী মূর্তি, তাকে এড়িয়ে যেতে পারো, প্রত্যাখ্যান করতে পারবে না। কিন্তু সেই পরিচিত লার্জার দ্যান লাইফ প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জী কে এই দুই সিনেমায় ঠিক খুঁজে পাওয়া যায়নি।

সেই কমার্শিয়াল, অনন্য ব্যক্তিত্ব, সুপারস্টার প্রসেনজিৎ কে পাওয়া যায় পরের বছর ‘বাইশে শ্রাবণ’ এ। অন্তত কাট টু কাট অ্যাকশন দৃশ্য না থাকলেও এক সাসপেন্স থ্রিলার, যার শুরু থেকেই চাবিকাঠি রয়েছে এক মাত্র প্রসেনজিতের চরিত্রের হাতে, অর্থাৎ সমস্ত সমস্যার থেকে মুক্তিদাতা দি প্রবীর রায় চৌধুরী কে কিন্তু ‘বাইশে শ্রাবণ’ সিনেমাতেই পাওয়া যায়। অর্থাৎ এই সিনেমা অর্থপূর্ণ কমার্শিয়াল নায়ক হিসেবে প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জী কে আবার প্রতিষ্ঠিত করে।

সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের বেশ কিছু সিনেমায় আমরা একটা প্যাটার্ন দেখতে পাই। সিনেমার মূল বিষয়ের পাশাপাশি একটা আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি থাকে, আরেকটা থিম যেটা সিনেমার গল্পে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকে। উদাহরণ হিসেবে ‘উমা’ তে যেমন একদিক দিয়ে মহিষাসুর মর্দিনীর পুরানগাথা, এক বাবা মেয়ের সম্পর্ক, মানবতার কথা বলে কিন্তু একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আসলে আমরা কিন্তু একটা সিনেমা তৈরির বিহাইন্ড দা সিন দেখেছি। একটা সিনেমা তৈরির পেছনে কত মানুষের পরিশ্রম, স্বপ্ন জড়িয়ে থাকে তার একটা ছবি দেখতে পাই আমরা। একই রকম ভাবে বাইশে শ্রাবণ কিন্তু কেবল কপ-ড্রামা সিরিয়াল কিলিং, ক্রাইম থ্রিলার নয়, এটা সমস্ত বাংলা কবিতা, বিশেষ করে হাঙ্গরি মুভমেন্টের প্রতি জানানো শ্রদ্ধার্ঘ্য।

যে আন্দোলন কড়া বাস্তবের দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ, দীনতাকে উজ্জ্বল আলোয় আনে তার কথা বলতে গেলে তোমাকে পরিবেশেও সেই রুক্ষতা, জীর্ণতা, ধসে পড়া অবস্থা নিয়ে আসতে হবে। পুরো সিনেমাতে আমরা সেটাই দেখি। “কবি” নিবারণ চক্রবর্তী যে বাড়িতে থাকেন, তার প্রকৃতি জীর্ণ, স্যাঁতসেঁতে। এক সরু, নোংরা গলিতে তার ভাঙাচোরা বাড়ি। দৈন্যের ছাপ সর্বত্র। এখানে নিবারণ চক্রবর্তীকে বুঝতে গেলে হাঙ্গরি আন্দোলন কে দেখতে হবে। গৌতম ঘোষ অভিনীত চরিত্র কিন্তু হাঙ্গরি কবিদের প্রতিচ্ছায়ার মত। একদিক দিয়ে ধরা যেতে পারে যে নিবারণ চক্রবর্তীর দৃশ্য গুলোয় দুটো আলাদা সময় এসে যোগ হয়। তাই তার বাড়িতে এক পুরোনো ভাঙ্গা মোবাইল ফোন ছাড়া সমস্ত কিছু পঞ্চাশ বছর (বর্তমান সময়ে ষাট) আগের মত।

যেভাবে ষাটের দশকে কবিদের কে অশ্লীল, দেশবিরোধী আখ্যা দিয়ে অপরাধী ঘোষণা করে দেওয়া হতো এবং তাদের কবিতাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেওয়া হতো, সেই সময়ে তাদের দম বন্ধ করা, হতাশাগ্রস্থ পরিস্থিতি খুব ভালো ফুটে উঠেছে এখানে। গোটা সিনেমা জুড়েই হাঙ্গরিয়ান আন্দোলনের অসংখ্য রেফারেন্স ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, তবে সবচেয়ে বড় রেফারেন্স বোধহয় যখন নিবারণ রাতের বেলায় খালি স্টেশনে এসে নিজের অনেক গুলো কবিতাকে লাইনে বিসর্জন দেয় আর উলটো দিকের প্ল্যাটফর্মে বসে থাকা এক মাতালকে নিজের কবিতা শোনাতে শুরু করে।

বাইশে শ্রাবণ

অশ্লীল সাহিত্য রচনা এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র – এই ছিল অভিযোগ;

হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো ছজন কবিকে, মদত দিল তাবৎ বুদ্ধিজীবীরা,

মাথায় ঘোমটা টেনে ফিচেল হাসি হাসলো ভিক্টোরিয়ান মরালিটি,

জল্লাদের উল্লাস মঞ্চে ডিস্কো নাচলো মাকাউলের জারজ সন্তানেরা।

সেই প্ল্যাটফর্মে দাড়িয়ে রেললাইনে কবিতা ফেলে দেওয়া অনেকটা কবিতার আত্মহত্যা; প্রয়োজনের তাগিদের সামনে কবিতার ভাবাদর্শের অপমৃত্যু।

পুরো সিনেমায় যদি প্রভাব বিস্তারকারী, শক্তিশালী চরিত্রদের খোঁজা হয়, নিশ্চিত করে বলা যায়, তিনজনের তালিকা তৈরি হবে – নিবারণ চক্রবর্তী, অভিজিৎ পাকড়াশী আর প্রবীর রায় চৌধুরী। যদি ‘দ্বিতীয় পুরুষ’ কে বাদ রেখে শুধু বাইশে শ্রাবণের ওপর নির্ভর করে অভিজিতের চরিত্রের ডেভলপমেন্ট লক্ষ্য করা হয়, একটা সম্পূর্ণ শুরু আর শেষ বিন্দু পাওয়া যাবে।

প্রথম থেকেই সে একজন সংবেদনশীল, শান্ত, ঠান্ডা মাথার চরিত্র হিসেবে সবার মুখে শুনছি, কিন্তু পর্দায় প্রথম আত্মপ্রকাশেই দেখা যাচ্ছে, সেই শান্ত ঠান্ডা ভাব উধাও, একটা বিরক্তি, রাগ তাকে গ্রাস করছে যার ভেতরে, মধ্যে মধ্যে আমরা দেখতে পাই সে গুমরে উঠেছে, তার মূল কারণ অবশ্যই আট মাস ধরে চলা অসমাধিত কেস, কিন্তু সেই সাথে পুলিশি জীবনে অপরাধের সাথে কারবার করা সাধারণ উদ্বেগ, অবসাদ যার জন্য তার স্বাভাবিক অমায়িকতা নষ্ট হচ্ছে, ব্যক্তিগত সম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে। সমস্যাপূর্ণ ছোটবেলা থেকে যে অনিশ্চয়তা গুলো তৈরি হয়েছে তাকে লুকিয়ে রাখার জন্য অভিজিৎ বাইরে নিজের চেহারায় গোঁফ, মোটা ফ্রেমের চশমা লাগিয়ে গম্ভীরতা আনতে চেয়েছে।

কিন্তু বাইরে তার কঠিন মেজাজ, অসাধারণ ট্র্যাক রেকর্ডের মধ্যে এখনো একজন অনিশ্চিত, নির্ভরশীল, সংবেদনশীল ছেলে, যে হয়ত নিজের জীবনে একজন মেন্টর ফিগারকে চাইছে। এই ব্যাপারটা খুব স্পষ্ট বোঝা যায়, যেখানে প্রবীর আর অভিজিৎ একসাথে বসে মদ খাচ্ছে। অভিজিৎ বাইরে যে কঠিন ইমেজ তৈরি করেছে তার বাইরে বেরিয়ে নিজের জীবনের দুর্বল দিক গুলো সামনে বলতে বেশ জড়তা বোধ করছে, থেমে থেমে অস্বস্তির সাথে কথা গুলো বেরিয়ে আসছে। ওখান থেকে বোঝা যায় যে বাবাকে হারাবার শোকের সাথে, মাকেও একা ফেলে আসার দুঃখ তার মধ্যে রয়ে গেছে (আমি এই কথাগুলোকে সত্যিই মনে করছি, দ্বিতীয় পুরুষ আমার জন্য আপাতত অস্তিত্বহীন), তাই যেকোনো কাছের মানুষকে হারিয়ে ফেলার উদ্বেগে ভোগে।

প্রেমের সম্পর্কেও তার প্রতিপক্ষ
সূর্য সিনহা, অপেক্ষাকৃত স্মার্ট, ফ্ল্যামবয়েন্ট। কেরিয়ার, লাভ লাইফ সমস্ত জায়গায় তার ফ্রাস্ট্রেশন, হীনমন্যতা তাকে গ্রাস করছে প্রতিনিয়ত। একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এই সিরিয়াল কিলারের কেসে পাকড়াশী কখনোই স্বস্তিতে ছিল না, এই উগ্র হিংসা তার কাছে আনকোরা এবং অসহনীয়। এটা বোঝা যায় যখন অভিজিৎ পুলিশ কমিশনারকে কেস রিপোর্ট দিচ্ছেন তখন দেখা যায় অভিজিৎ বিকৃত রক্তাক্ত লাশ গুলোর দিকে চোখ চেয়ে দেখতে পারছে না, বার বার আড় দৃষ্টিতে স্লাইড পাল্টাচ্ছে। ছবিগুলোর দিকে চেয়ে থাকার থেকে কবিতা আওড়ানো তার কাছে অনেক সুবিধের।

ঠিক এই জায়গায় আসে প্রবীর চৌধুরী, যার চরিত্র, মানসিক প্রকৃতি সম্পূর্ণ উল্টো। তার  প্রিয় গন্ধ গুলো আর পাঁচটা বাঙালির মত কাব্যিক নয়, বরং উৎকট ধরনের। এই সিনেমায় সৃজিত মুখার্জীর চিত্রনাট্যের অসাধারণত্ব এখানেই, প্রথম দৃশ্যেই দুই চরিত্রের দ্বন্দ্ব, দর্শকের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রতিটা লাইনে পরস্পরবিরোধী একটা ছবি ফুটে ওঠে। কিন্তু তা সত্ত্বেও অভিজিতের জীবনের কাঙ্ক্ষিত মেন্টর হয়ে ওঠে প্রবীর চৌধুরী। ধমকে দুর্বল সময়ে শক্ত হতে বলা থেকে, নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে উপদেশ দেওয়া; কেরিয়ার, অতীত, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সবেতেই সমাধানকর্তা হয়ে ওঠেন।

বাইশে শ্রাবণ’ সিনেমার সবচেয়ে সেরা ডায়লগ গুলো পরিচালক প্রসেনজিতের চরিত্রকে উপহার দিয়েছেন, যার মধ্যে আইকনিক ভাতডাল – বিরিয়ানী – নেসেসিটি – লাক্সারি র মত এভারগ্রীন উক্তি রয়েছে। প্রবীর চৌধুরীর পর্দায় উপস্থিতিতে একটা জিনিস প্রায়শই দেখা যায়; দাবার বোর্ড।  বেশির ভাগ সময়, এমনকি অভিজিতের ইলিউশনেও প্রবীর চৌধুরী একাই খেলছে। এমনকি দুই দৃশ্যে প্রবীর বিপরীত পক্ষের খেলোয়াড়ের চালের ভুল শুধরে দিচ্ছে আবার অন্য দুজনের খেলায় সঠিক চাল চেলে দিচ্ছে। স্পষ্টতই এটা বোঝায় এই পুরো সিরিয়াল মার্ডার রহস্যে দুই পক্ষই তার কব্জায়। অপরাধের ঘুটি সাজানো যেমন তার হাতের ইশারায়, তেমনি ডিপার্টমেন্টের চোখে অপরাধের জাল গুটিয়ে আনার চালেও তিনিই স্বচ্ছন্দ কিস্তিমাত করেন।

কিন্তু পুরোনো ঘটনা থেকেই বোঝা যায় প্রবীর চৌধুরীর অপরাধীদের শাস্তি দিতে কোনো রকম নিয়ম – নীতির তোয়াক্কা না করলেও, আইন ও বিচারের প্রতি তার একটা তীব্র সেন্টিমেন্ট কাজ করে, যার জন্য তার জীবনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সম্মান, মর্যাদা পাওয়ার পরও একটা অপরাধবোধ কাজ করে, যার জন্য শেষ পর্যন্ত তার আত্মহননের পথ বেছে নেয়। বা বলা যায় নিজের তৈরি জালে শেষ পর্যন্ত নিজেই ডুবে যান। প্ল্যান করা পারফেক্ট ক্রাইমে তাকে কি বলিদান দিতে হয়েছে? তার মরাল কোড। আবার অন্যদিক দিয়ে দেখলে, অভিজিতের সাথে প্রবীরের একটা অপত্য সম্পর্ক তৈরি হয়, যার জন্য নিজের স্নেহের পাত্রের কাছে ছোটো হয়ে যাওয়া হয়ত মেনে নিতে পারেনি, সেই মানুষটা যার কাছে দিনের শেষে ইমেজ টাই আসল।

পুরোটা দেখলে বোঝা যায় অভিজিৎ সারাজীবন যেমন একজন ফাদার ফিগার খুঁজে বেড়িয়েছে, তেমনি প্রবীর নিজের হৃত গৌরব, সম্মান ঘুরে পেতে চেয়েছে। কিন্তু সব শেষে যেমন অভিজিৎ নিজের এই মেন্টর কে হারায়, তেমনি প্রবীর চৌধুরীও অল্প সময়ের জন্য পাওয়া সম্মান আবার হারিয়ে ফেলে। এই সমাজে প্রতিটা মানুষের ইচ্ছেই অপূর্ণ থাকে, সে   নিবারণ চক্রবর্তী, অভিজিৎ পাকড়াশী, প্রবীর চৌধুরী হোক, বা অমৃতা চৌধুরী কিংবা সূর্য সিনহা। আর এই অপূর্ণতাই ‘বাইশে শ্রাবণ’ ছবির সেরা প্রাপ্তি।

Follow us on FacebookTwitter

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here